ভোলার শহীদ মোহাম্মদ হানিফ : বাংলাদেশের এক গর্বিত সূর্য সন্তান
নিজস্ব প্রতিবেদক
5
প্রকাশিত: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ১১:০৭:৫৮ এএম
ভোলার শহীদ মোহাম্মদ হানিফ
ভোলাদর্পণ প্রতিবেদক : বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অসংখ্য বীর, শহীদ ও আত্মত্যাগের মহিমায় চিরভাস্বর। সেই সব অকুতোভয় দেশপ্রেমিকদের একজন হলেন শহীদ মোহাম্মদ হানিফ—ভোলা জেলার এক কৃতী সন্তান, যিনি স্বাধীনতার স্বপ্নকে হৃদয়ে ধারণ করে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
শহীদ মোহাম্মদ হানিফ ১৯৪১ সালের ১৬ জুন বর্তমান ভোলা সদর উপজেলার পশ্চিম চর নোয়াবাদ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন হাবিবুর রহমান এবং মাতা জামিলা খাতুন।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, সৎ, মানবিক এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ একজন মানুষ।
তিনি ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনে তাঁর মেধা, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বগুণ তাঁকে সবার কাছে শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি তৎকালীন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে (বর্তমান সোনালী ব্যাংক লিমিটেড) যোগদান করেন। কর্মদক্ষতা ও সততার মাধ্যমে তিনি দ্রুতই সুনাম অর্জন করেন। ১৯৭১ সালে তিনি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের আহসানগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি নিরপেক্ষ দর্শকের ভূমিকা গ্রহণ করেননি; বরং স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করতেন।
দেশের স্বাধীনতার স্বার্থে তিনি অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে ব্যাংকের প্রায় ৩০ হাজার টাকা সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সদস্য আবুল হাশেম-এর মাধ্যমে আরেক সদস্য ওয়াহিদুর রহমান-এর হাতে তুলে দেন, যাতে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন ও যুদ্ধ পরিচালনায় আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত হয়। সে সময় এটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
সেই সময় তিনি স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আত্রাই রেলস্টেশন সংলগ্ন রেলি ব্রাদার্স কলোনি এলাকায় বসবাস করতেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তাঁর সক্রিয় অবস্থানের খবর স্থানীয় রাজাকারদের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছে পৌঁছে যায়। ফলে তিনি পাকবাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে তিনি ১৯৭১ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রাজিয়া বুলবুল, এক কন্যা ও দুই পুত্রকে আত্রাই থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরের সিংসাড়া (সিংড়া) গ্রামের মকবুল চেয়ারম্যানের বাড়িতে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে দেন। আর নিজে বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন।
কিন্তু পরিবারের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা তাঁকে বারবার স্ত্রী-সন্তানদের কাছে টেনে নিয়ে যেত। ২৫ মে ১৯৭১ সালে স্ত্রী ও সন্তানদের দেখতে সিংসাড়ায় গেলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হন। ওই দিন সংঘটিত সিংসাড়া গণহত্যায় তিনি শহীদ হন। তাঁর শাহাদাত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর অথচ গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।
স্বামীর শাহাদাতের পর স্ত্রী রাজিয়া বুলবুল অকল্পনীয় দুঃখ-কষ্ট, সংগ্রাম ও প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের মানুষ করার কঠিন দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। তিনি সত্যিকার অর্থেই একজন রত্নগর্ভা জননী। তাঁর অদম্য সাহস, ত্যাগ ও অধ্যবসায়ের ফলেই সন্তানরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পিতার আদর্শকে সমুন্নত রেখেছেন।
তাঁদের বড় মেয়ে ফাতেমা জোহরা ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বড় ছেলে মো. মিজানুর রহমান সোনালী ব্যাংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মেজো ছেলে মশীহুর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মেজর জেনারেল পদে দেশসেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। ছোট ছেলে মাহবুবুর রহমান বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডে ভোলা অঞ্চলে কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
শহীদ মোহাম্মদ হানিফ শুধু একটি পরিবারের অভিভাবক ছিলেন না; তিনি ছিলেন স্বাধীনতার আদর্শে বিশ্বাসী এক নির্ভীক দেশপ্রেমিক।
তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাধীনতার প্রতিটি অর্জনের পেছনে রয়েছে অসংখ্য শহীদের রক্ত, অশ্রু ও ত্যাগের ইতিহাস।
আজ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব হলো এই মহান শহীদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা, তাঁর আত্মত্যাগকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং দেশপ্রেম, সততা ও মানবিকতার আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করা। ভোলার গর্বিত সন্তান শহীদ মোহাম্মদ হানিফ চিরকাল বাঙালির ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
আরও পড়ুন:
জাতীয় সম্পর্কিত আরও
ভোলার শহীদ মোহাম্মদ হানিফ : বাংলাদেশের এক গর্বিত সূর্য সন্তান
২৬ জুলাই ২০২৬
ভোলার শহীদ মোহাম্মদ হানিফ : বাংলাদেশের এক গর্বিত সূর্য সন্তান
২৫ জুলাই ২০২৬
সংসদে নতুন দায়িত্ব পেলেন হাফিজ ইব্রাহিম
১২ জুলাই ২০২৬
ভোলার চরফ্যাশন এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুর
১২ জুলাই ২০২৬
ভোলায় বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে র্যালি ও আলোচনা সভা
১০ জুলাই ২০২৬
ভোলায় দিনব্যাপী চাকরি মেলার উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান
২১ জুন ২০২৬
